খুলনা | সোমবার | ২৭ জুলাই ২০২৬ | ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩

কেসিসির প্রায় ৮২৩ কোটি টাকার মেগা ড্রেনেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন সত্তে¡ও সুফল থেকে বঞ্চিত নাগরিকেরা

খুলনার জলাবদ্ধতা : প্রকৃতির দায় নাকি পরিকল্পনার পঙ্গুত্ব?

জয়া মাহবুব |
০২:১০ এ.এম | ২৭ জুলাই ২০২৬


প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড খুলনা এক চেনা সংকটের মুখোমুখি হয়। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ভারী বৃষ্টির খবর মানেই নগরের বহু মানুষের কাছে ঘরবন্দি জীবন, ডুবে যাওয়া প্রধান সড়ক, বন্ধ শিক্ষা কার্যক্রম এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার আরেকটি অধ্যায়। জলাবদ্ধতা যেন এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যলিপি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সংকটকে কি আমরা কেবলই জলবায়ু পরিবর্তনের একটি অবধারিত ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলে মেনে নেব, নাকি এর নেপথ্যে থাকা কাঠামোগত ত্র“টি, ত্র“টিপূর্ণ প্রকৌশল নকশা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সমন্বয়হীনতাকে পুনর্মূল্যায়নের আওতায় আনব?
ভৌগোলিক দিক থেকে খুলনা একটি নদীবেষ্টিত ও নিচু এলাকা, যা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আকস্মিক অতিবৃষ্টি এবং উচ্চ জোয়ারের ঝুঁকিতে রয়েছে। কিন্তু একটি আধুনিক নগর বছরের পর বছর একই সংকটে হাবুডুবু খেতে পারে না; বিশেষ করে যেখানে বিগত একদশকে ড্রেনেজ অবকাঠামোর উন্নয়নে শত-শত কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ ও প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। বাস্তবচিত্র হলো খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) প্রায় ৮২৩ কোটি টাকার মেগা ড্রেনেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন সত্তে¡ও সুফল থেকে বঞ্চিত নাগরিকেরা। খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), সিটি কর্পোরেশন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পানি উন্নয়ন বোর্ড) মতো মূল সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে নীতিগত ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণেই মূলত বিপুল বাজেট খরচের পরেও কাক্সিক্ষত ফলাফল মিলছে না। জলাবদ্ধতা এখন আর কোনো আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি মূলত বৈজ্ঞানিক সমীক্ষাহীন নগর পরিকল্পনা ও নীতিগত দূরদর্শিতার অভাবজনিত একটি মানবসৃষ্ট সংকট।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এবং ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম)-এর একাধিক গবেষণায় এই সংকটের মূল কারিগরি গলদগুলো নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষক দল যখন নগরের ড্রেনেজ ক্যারেক্টারিস্টিকস অ্যানালিসিস করতে ‘হর্টনের সমীকরণ’ এবং ‘ম্যানিংয়ের সমীকরণ’ ব্যবহার করে রেনফল-রানঅফ মডেল তৈরি করেন, তখন অত্যন্ত উদ্বেগজনক এক বাস্তবতা সামনে আসে। 
গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমান ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের ধারণক্ষমতা ও ভূ-তাত্তি¡ক ঢাল নগরের সামগ্রিক জলনিষ্কাশন চাহিদার সাথে মারাত্মকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। যখনই বৃষ্টির তীব্রতা ঘণ্টায় ৫০ মিলিমিটারের ওপর যায় এবং তা দুই ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয়, তখনই বিদ্যমান ড্রেনগুলো সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ে।
এখানেই শেষ নয়, আইডব্লিউএম-এর গাণিতিক সিমুলেশনে দেখা গেছে, খুলনার মূল ভৌগোলিক উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২ থেকে ৪.৫ মিটার। এই নিচু ভূমিরূপের কারণে শহরের প্রধান প্রাকৃতিক খালগুলো (যেমন ময়ূর খাল, খুদে খাল ইত্যাদি) যখন রূপসা ও  ভৈরব নদের সাথে যুক্ত হয়, তখন সেখানে জোয়ার-ভাটার তীব্র প্রভাব বা ‘টাইডাল ইফেক্ট’ কাজ করে। অথচ প্রকল্প প্রণয়নের সময় দীর্ঘমেয়াদি হাইড্রোলজিক্যাল ডেটা এবং নদীর সর্বোচ্চ জোয়ারের স্তরের সাথে ইন-সিটি ড্রেনগুলোর আউটফলের উচ্চতা সমন্বয় করা হয়নি। ফলে নদীতে জোয়ার এলে শহরের স্লুইস গেট বন্ধ রাখতে হয়, আর তখনই ড্রেনের পানি নিষ্কাশিত না হয়ে উল্টো নদী থেকে শহরের দিকে ব্যাকফ্লো করে। এটি প্রকৃতির ত্র“টি নয়, ত্র“টিপূর্ণ প্রকৌশল বা ‘পরিকল্পনাগত অন্ধত্ব’।
এই ভুল পরিকল্পনার মনস্তাত্তি¡ক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ ও প্রান্তিক অর্থনীতি। জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়া কেবলই একটি সাময়িক ছুটি নয়, এটি প্রান্তিক পরিবারের সন্তানদের প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বিঘিœত করে। একইভাবে, শহরের প্রান্তীয় অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে ফসল ও বীজতলা ধ্বংস হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর। জলাবদ্ধতার কারণে রিকশাচালক, দিনমজুর এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দৈনিক আয়ের যে ক্ষতি হয়, তার সুনির্দিষ্ট সামষ্টিক অর্থনৈতিক হিসাব আমাদের নীতিনির্ধারকদের টেবিলে অনুপস্থিত।
প্রকৃতপক্ষে, এই জলাবদ্ধতা নিম্নআয়ের মানুষের ওপর একটি অলিখিত ‘ক্লাইমেট ট্যাক্স’ বা পরিবেশগত জরিমানা চাপিয়ে দিচ্ছে। এই কর তারা পরিশোধ করছে প্রতিদিনের কর্মঘণ্টা হারিয়ে, যাতায়াতের বাড়তি ভাড়ায়, ঘরবাড়ি মেরামত আর নোংরা পানি বাহিত রোগের চিকিৎসার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করে, যার কোনো হিসাব রাষ্ট্রের জিডিপির খাতায় থাকে না।
একই সাথে, শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ড্রেনগুলোর মুখে আক্ষরিক অর্থেই শ্বাসরোধ তৈরি করছে। এছাড়া নগরের প্রাকৃতিক শিরা-উপশিরা সমতুল্য খালগুলোকে উন্মুক্ত ও প্রবাহমান না রেখে অপরিকল্পিতভাবে বক্স কালভার্ট তৈরি বা ড্রেনের মুখ সরু করে ফেলা জলপ্রবাহকে আরও স্থবির করে দিয়েছে। তবে নাগরিক সচেতনতাকে ঢাল বানিয়ে নীতিনির্ধারকেরা দায় এড়াতে পারেন না; আধুনিক এবং উৎস-ভিত্তিক বর্জ্য পৃথকীকরণ ব্যবস্থা ও সুপরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রাথমিক দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট নগর কর্তৃপক্ষেরই।
এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের প্রচলিত ‘তাৎক্ষণিক বা অ্যাড-হক’ প্রকল্পভিত্তিক চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে একটি আমূল নীতিগত সংস্কার করতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে, খুলনার জলবায়ু স্থিতিস্থাপক মাস্টারপ্ল্যানে বৈজ্ঞানিক হাইড্রোলজিক্যাল ও হাইড্রোলিক মডেলিংকে বাধ্যতামূলক করা এবং সেবা সংস্থাগুলোর (কেসিসি, কেডিএ, পাউবো) মধ্যে এক ছাতার নিচে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, ময়ূর খালসহ প্রধান প্রবাহমান খালগুলোর অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে সেগুলোর গভীরতা এবং সংযোগ সচল করতে হবে, যাতে সেগুলো বাফার জোনের মতো অতিরিক্ত জল ধারণ করতে পারে। তৃতীয়ত, ড্রেনের উচ্চতা এবং আউটলেটগুলোর মুখে স্বয়ংক্রিয় সেন্সরযুক্ত পাম্পিং স্টেশন ও জোয়ার প্রতিরোধক আধুনিক স্লুইস গেট স্থাপন করতে হবে, যা টাইডাল ব্যাকফ্লো রোধ করবে। সেই সাথে বর্ষার মৌসুমে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে শহরজুড়ে অতি-সংবেদনশীল পয়েন্টগুলোতে পর্যাপ্ত শক্তিশালী পাম্প স্থাপন করে জরুরি নিষ্কাশন প্রটোকল চালু রাখা দরকার।
খুলনার মানুষ আসলে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে না; তারা মূলত বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা নীতিগত অবহেলা আর সমন্বয়হীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। কোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি তাকে ‘স্বাভাবিক বাস্তবতা’ হিসেবে বৈধতা দিতে পারে না। প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, কিন্তু প্রকৃতির চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা করা অবশ্যই সম্ভব। 
নীতিনির্ধারকদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি সংকটটিকে স্রেফ একটি ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলে ফাইলবন্দী করে রাখবেন নাকি টেকসই, বিজ্ঞানভিত্তিক ও জবাবদিহিতামূলক পানি ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে খুলনার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করবেন?

প্রিন্ট

আরও সংবাদ